অর্ধাঙ্গী (নারী জাগরণ)
কোন রোগীর চিকিৎসা করিতে হইলে প্রথমে রোগের অবস্থা জানা আবশ্যক (নারীর অধঃপতিত দশা থেকে মুক্তির জন্য প্রথমে তাদের হীনদশার স্বরূপ উন্মোচন জরুরি)। তাই অবলাজাতির (নারী) উন্নতির পথ আবিষ্কার করিবার পূর্বে তাহাদের অবনতির চিত্র দেখাইতে হয়। আমি “স্ত্রীজাতির অবনতি” প্রবন্ধে ভগিনীদিগকে জানাইয়াছি যে, আমাদের একটা রোগ আছে — ‘দাসত্ব’ (মানসিক দাসত্ব ও নারীর ব্যক্তিত্বহীনতা)।
আমি অবরোধ প্রথার (পুরুষশাসনের ফলে গৃহবন্দি হওয়া অন্তঃপুরের নারী) বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হই নাই। কেহ যদি আমার “স্ত্রীজাতির অবনতি” প্রবন্ধে পর্দাবিদ্বেষ ছাড়া আর কোন উদ্দেশ্য দেখিতে না পান, তবে আমাকে মনে করিতে হইবে আমি নিজের মনোভাব উত্তমরূপে ব্যক্ত করিতে পারি নাই অথবা তিনি প্রবন্ধটি মনোযোগ সহকারে পাঠ করেন নাই।
কোন নতুন কাজ করিতে গেলে সমাজ প্রথমত গোলযোগ উপস্থিত করে (নতুনকে মেনে নিতে সংকোচ) এবং পরে সেই নূতন চাল চলন সহিয়া লয়, তাহারই দৃষ্টান্তস্বরূপ পার্সি মহিলাদের পরিবর্তিত অবস্থার উল্লেখ করিয়াছি। পূর্বে তাঁহারা বাইরে যাইতে পারতেন না, এখন তাঁহারা পর্দা ছাড়িয়াছেন, কিন্তু মানসিক দাসত্ব কি মোচন হইয়াছে?
কলম্বস যখন আমেরিকা আবিষ্কার করিতে গিয়েছিলেন, তখন লোকে তাঁহাকে বাতুল বলেছিল (অবিশ্বাস্য কাজে হাত দেওয়ায়)। নারী আপন স্বত্ব বুঝিয়া নরের ন্যায় শ্রেষ্ঠ হইতে চাহে, ইহাও কি বাতুলতা?
পুরুষগণ স্ত্রীজাতির প্রতি যতটুকু সম্মান প্রদর্শন করেন, তাহাতে আমরা সম্পূর্ণ তৃপ্ত হইতে পারি না (পুরুষদের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে)।
নারীকে শিক্ষার দিবার জন্য গুরুলোকে সীতা দেবীকে আদর্শরূপে দেখানো হয়। রাম-সীতা সম্পর্ক ব্যঙ্গের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে — পুতুলের সঙ্গে বালকের সম্পর্ক এর মতো, যেখানে নারী কেবল অচেতন পুতুল।
রোকেয়া বলেন, “আমরা অর্ধাঙ্গী” — কিন্তু বাস্তবে পুরুষ সমাজ আমাদেরকে এমনভাবে রেখেছে যে, এক চক্র বড়, এক চক্র ছোট দ্বিচক্র রথের মতো সমাজ অগ্রসর হতে পারছে না।
তিনি বলেন, মাতৃহৃদয়ে পক্ষপাতিতা নাই। সুতরাং ঈশ্বরও পক্ষপাতী নন। আমরা অর্ধেক নই, সমান।
রোকেয়া নারীদের শিক্ষা নিয়ে বলেন — আমরা পশ্চাতে আছি কারণ সুশিক্ষা পাই নাই। (শিক্ষাই নারী উন্নতির মূল চাবিকাঠি)।
শেষে তিনি আহ্বান জানান — নারী যেন নিজেকে অবলা না ভাবে; কারণ “অবলার হাতেও সমাজের জীবন-মরণের কাঠি আছে।”
